নিজের কাছ থেকে পদত্যাগ
এই অধ্যায়টি বইয়ের মতো করেই পড়ুন: উল্টানো পাতা, আর আপনার জায়গা সংরক্ষিত থাকে।এই অধ্যায়টি বইয়ের ভেতরে খুলুন

একাদশ অধ্যায়

যে অতিথিদের ডাকিনি

ভয়ংকর চিন্তা মাথায় আসে কেন, অথচ তা তোমার সম্পর্কে কিছুই বলে না?

পড়তে প্রায় 6 মিনিট

ছোট জামার হাতা

লিনা সাক্ষাৎকারের বার্তাটা বন্ধ করল। বোনের দরজায় কড়া নাড়ার আগে ফোন ব্যাগে রাখল। এখনও বুধবার সন্ধ্যাটা ডিজাইনের কোর্সের জন্য রেখে দেয়। তার কয়েকটি কাজ এখন ছোট একটা পোর্টফোলিওতে জায়গা পেয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে চাকরির আবেদনের সঙ্গে তা পাঠিয়েছিল। দরজায় বোন বলল: “ঠিক সময়ে এসেছ”।

বোন তার কোলের শিশুকন্যাকে লিনার হাতে দিয়ে রান্নাঘরে ফিরে গেল। ছয় মাসে পড়ে মেয়েটা হাতের কাছে যা পায়, ধরে ফেলে। লিনার হাতা আঁকড়ে মুখের দিকে টানল। লিনা হেসে আলতো করে কাপড়টা সরাল।

তারপর এক ঝলক ছবি মাথায় এল। শিশুটি তার হাত ফসকে পড়ে যাচ্ছে। কিছুই ঘটেনি। শিশুটি হাতা ধরে থাকল। ছোট ছোট শব্দ করতে থাকল। সেই শব্দের সঙ্গে লিনার গলায় হঠাৎ উঠে আসা বমিভাবের কোনো মিল নেই।

রান্নাঘর থেকে বোন ডাকল: “টিস্যু তোমার পাশে”। লিনা নিজের হাতের দিকে তাকাল, যেন প্রথম দেখছে। আঙুল শিথিল করার বদলে শিশুর পিঠের চারপাশে আরও ছড়িয়ে দিল। বোনকে ডাকতে চাইল। কিন্তু যে এক সেকেন্ডে কিছুই ঘটেনি, তার কথা কীভাবে বলবে?

লিনা শিশুটিকে বোনের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, পানি দরকার। পরেরবার গিয়ে দোলনার কাছে বসা এড়াল। বোন চা তৈরি শেষ করতে শিশুটিকে ধরতে বলল। সে বলল: “পিঠে ব্যথা করছে”।

খেয়াল করল, ছবিটা মনে বারবার দেখছে। নিশ্চিত হতে চাইছে, ওটা সে চায়নি। নিজেকে আশ্বস্ত করল। তারপর আবার পরীক্ষা করল। প্রতিবারই আরও বেশি সময় লাগল। একটা টিস্যু টেনে নিয়ে হাঁটুর ওপর দুবার ভাঁজ করল। রান্নাঘর থেকে বোনের প্রশ্ন শুনল: “চিনি?” বলল: “অল্প”। সহজ একটা প্রশ্ন বোনের সঙ্গে কাটানো এই সময়টায় তার মন ফিরিয়ে আনতে পারত। কিন্তু সে একা যে প্রশ্ন তৈরি করেছে, তার উত্তরই খুঁজতে থাকল।

নীরব কোনো হলঘরে চিৎকার করার চিন্তা তোমার মাথায় আসতে পারে। অথচ তুমি তা চাও না। চিন্তাটা কি তোমার ইচ্ছার বর্ণনা? নাকি মাথায় হঠাৎ এসে যাওয়া কিছু? এই অতিথি তোমাকে ধাক্কা দিলে কী করো? তাড়া করো? নাকি দিন থামিয়ে খুঁজতে থাকো, সে তোমার সম্পর্কে কী বলছে?

চিন্তা আসা মানে তা চাওয়া নয়

এমন চিন্তা মাথায় এলে কি বোঝায় যে সত্যিই তা চাও? কিংবা তা তোমার ভেতরের লুকানো কিছু প্রকাশ করে? কোনোটাই সত্যি নয়।

তোমার মন সারা দিন এলোমেলো চিন্তা তৈরি করে। কিছু সুন্দর। কিছু অদ্ভুত। কিছু খুব অস্বস্তিকর। বেশির ভাগই খেয়াল না করে পার হয়ে যাই। অল্প কয়েকটি ধাক্কা দেয়। আমরা সেগুলোর সামনে অনেকক্ষণ থেমে থাকি।

একটি পুরোনো গবেষণায় গবেষক জ্যাক র‍্যাকম্যান ও পদ্মল ডি সিলভা সাধারণ মানুষকে প্রশ্ন করেন। রোগীদের নয়। তাঁরা জানতে চেয়েছিলেন: অস্বস্তিকর, আক্রমণাত্মক কিংবা অদ্ভুত চিন্তা কি তাদের মাথায় আসে?1

প্রায় 80% হ্যাঁ বলেছিল। তাদের চিন্তার ধরন ও কিছু বিষয়বস্তুর সঙ্গে অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত মানুষের চিন্তার মিল ছিল। তবে কতবার আসে, কতক্ষণ থাকে, কতটা তীব্র হয় এবং কী প্রভাব ফেলে, তাতে পার্থক্য ছিল।

কয়েক দশক পরে আন্তর্জাতিক একটি গবেষক দল শত শত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর তথ্য একত্র করে। ছয়টি মহাদেশের 13টি দেশ থেকে2। 90%-এর বেশি নিশ্চিত করেছে, অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা মাঝেমধ্যে তাদের আসে। কখনো ক্ষতি নিয়ে, কখনো সন্দেহ, কিংবা এমন ছবি, যা তারা দেখতে চায় না। বাইরে থেকে যত শান্তই দেখাক, প্রায় কেউই এর বাইরে ছিল না।

কিছু চিন্তায় তুমি যা নিয়ে ব্যস্ত থাকো, কিংবা যার জন্য ভয় পাও, তার ছাপ থাকে। কিছু আসে এমন কোনো কারণ ছাড়াই, যা তুমি চিহ্নিত করতে পারো। চিন্তাকে চলে যেতে দিতে প্রতিটির কারণ জানতে হবে না।

অতিথিকে বিশ্বাস করলে, কিংবা জোর করে তাড়া করলে

প্রথম ভুল হলো অতিথিকে বিশ্বাস করা। মনে করা, চিন্তাটা ভেতরের সত্যিকারের অভিপ্রায় প্রকাশ করে। থেরাপিস্ট রাস হ্যারিস একে বলেন চিন্তার সঙ্গে এক হয়ে যাওয়া। তিনি তাঁর The Happiness Trap3 বইয়ে ব্যাখ্যা করেন, চিন্তা তোমার সঙ্গে লেগে গেলে সেটাকেই তুমি নিজের পরিচয় মনে করো। মাথায় আসা একটি চিন্তা বা ছবি হয়ে থাকে না।

বিকল্প হলো চিন্তা থেকে আলাদা হওয়া: একটু দূর থেকে চিন্তাটাকে খেয়াল করা। নিজেকে বলো, “খেয়াল করছি, আমার মাথায় এমন চিন্তা এসেছে”। “আমি এমন” নয়। শুধু এই দূরত্বই তার আঁকড়ে ধরার শক্তি কমায়। তাহলে ক্ষণিকের অতিথিকে নিজের ওপর রায় দেওয়ার ক্ষমতা দিই কেন?

দ্বিতীয় ভুল হলো অতিথিকে জোর করে তাড়া করা। নিজেকে বারবার বলি: এটা ভেবো না, এটা ভেবো না। এখানেই উল্টো ঘটনা ঘটে।

মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল ওয়েগনার তাঁর “White Bears and Other Unwanted Thoughts”4 বইয়ে ব্যাখ্যা করেন, চিন্তা তাড়ানো কেন কঠিন। এক দলকে পাঁচ মিনিট সাদা ভালুকের কথা না ভাবতে বলেন। প্রতিবার মনে এলে ঘণ্টা বাজাতে বলেন5। তারা খুব চেষ্টা করেছে। তবু বারবার ঘণ্টা বাজিয়েছে। আরও অদ্ভুত হলো, পরে যখন তাদের ভালুকটার কথা ভাবতে বলা হয়, তারা শুরু থেকেই ভাবতে বলা দলের চেয়ে বেশি ভেবেছে।

দমন করা আর চিন্তা থেকে আলাদা হওয়ার পার্থক্য ছোটখাটো নয়। তাড়ানো মানে চিন্তাকে বলা: বেরিয়ে যাও। শুধু এতেই মনোযোগ তার দিকে আটকে থাকে। আর আলাদা হওয়া বলে: চাইলে এসে যাও। তোমাকে থামাব না, পিছু নেবও না। সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তি পেতে হবে, এমন শর্ত নেই। চিন্তাটা থাকা অবস্থাতেও গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালিয়ে যাওয়া। এটাই সেই পরিবর্তন, যার অনুশীলন করছ।

যখন প্রশ্নটা মুখে বলা হলো

আবু হুরায়রা বর্ণনা করেন, নবী ﷺ-এর কয়েকজন সাহাবি তাঁর কাছে এসে নিজেদের মনের এমন কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করেন, যা মুখে বলা তাঁদের কাছে গুরুতর মনে হতো। তিনি জিজ্ঞেস করেন, তাঁরা সত্যিই এমনটা পেয়েছেন কি না। তাঁরা হ্যাঁ বলেন। বর্ণনায় প্রশ্ন ও উত্তর আছে। চিন্তাগুলো কার কার ছিল, নাম বলা হয়নি। প্রতিটি চিন্তার আলাদা বর্ণনাও দেওয়া হয়নি6.

তাঁরা এসেছিলেন। প্রশ্ন করেছিলেন। মনের মধ্যে যা পাচ্ছিলেন, তা মুখে বলা প্রশ্ন হলো। একা একা নিজের ওপর দেওয়া রায় হয়ে থাকল না।

“এটাই খাঁটি ঈমান” (মুসলিম 132)

নবী ﷺ কথাটা সেই সাহাবিদের বলেছিলেন, যাঁরা এমন চিন্তার অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন, যা মুখে বলতে লজ্জা পেতেন। তিনি তিরস্কার করেননি। আশ্বস্ত করেছেন। চিন্তাটাকে গুরুতর মনে করা ও তাতে অস্বস্তি বোধ করা, এটাই খাঁটি ঈমান। তার বিপরীত নয়। অন্য জায়গায় মাথায় আসা কুমন্ত্রণার জন্য একটি ব্যবহারিক পদক্ষেপ আছে: “সে যেন আল্লাহর আশ্রয় চায় এবং থেমে যায়” (বুখারি 3276)7। অর্থাৎ তর্ক করে চিন্তাটার পিছু নেওয়া থামাও। তার সঙ্গে এমন আলোচনা শুরু কোরো না, যার শেষ নেই।

ক্ষণিকের অতিথি

কখন ব্যবহার করবে: কোনো অস্বস্তিকর চিন্তাকে নিজের অভিপ্রায় বা নিজের ওপর রায় বানিয়ে ফেললে। সময়: নাম দিতে এক মুহূর্ত। তারপর চলমান কাজে ফেরা। চিন্তাটা অদৃশ্য হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা কোরো না।

চলে যেতে দাও। কখন চলে যায় তা দেখার জন্য দিন থামিয়ো না।

  1. চিন্তা বলো, সত্য নয়: অস্বস্তিকর চিন্তা এলে মনে মনে বলো: “এটা ক্ষণিকের চিন্তা”। “এটাই আমি” নয়। প্রথম কথাটা দূরত্ব তৈরি করে। দ্বিতীয়টা তা বন্ধ করে।
  2. তর্ক কোরো না: বারবার জেরায় ঢুকো না। কেন এটা ভাবলাম? সত্যিই যদি চাই? প্রতিটি চিন্তা থেকে নিশ্চিত উত্তর ছিনিয়ে আনতে হবে না।
  3. তাড়িয়ে দিয়ো না: আসতে দাও। সব মনোযোগ তাকে দিও না। প্রতি মুহূর্তে দেখো না, চলে গেল কি না।
  4. নির্দিষ্ট কোনো কাজে ফেরো: যে পাতাটা পড়ছিলে, শেষ করো। কিংবা লেকচারে মন ফেরাও। অথবা কাপড় ভাঁজ করতে থাকো। দিন চালিয়ে যাওয়ার জন্য চিন্তা চলে যাওয়ার অপেক্ষা কোরো না।
  5. আজ রাতে চেষ্টা করো: পরেরবার অস্বস্তিকর চিন্তা এলে তার নাম দাও “ক্ষণিকের অতিথি”। তারপর যে কাজ করছিলে, চালিয়ে যাও। কিছু অস্বস্তি থাকলেও।

পড়ে গেলে: চিন্তাটার সঙ্গে আবার তর্কে ফিরলে তা খেয়াল করো। একই কাজে ফিরে যাও। প্রথম বিচার দীর্ঘ হয়েছে বলে দ্বিতীয় বিচার শুরু কোরো না।

লিনা আবার শিশুটিকে কোলে নিলে ছবিটা ফিরে এল। মনে মনে বলল: “খেয়াল করছি, আমার মাথায় এই চিন্তা এসেছে”। তারপর সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে জিজ্ঞেস করল, ঠিকভাবে কথাটা বলেছে কি না। আগের চেষ্টাটা যাচাই করতে আরেকটা চেষ্টা শুরু হলো।

কী করছে খেয়াল হলো। “পড়ে গেলে” লাইনে ফিরল। তর্ক ছেড়ে কাজ চালিয়ে যাও। শিশুর হাতা ঠিক করল। চায়ে বোন কতটা চিনি দিয়েছে, তা নিয়ে কথা বলতে লাগল। কিছু অস্বস্তি রয়ে গেল। তবু লিনা বোনের বাড়িতেই রইল।

যাওয়ার আগে বোনকে বলল: “হাত থেকে ও পড়ে যাচ্ছে, এমন একটা ছবি মাথায় এসেছিল। ভয় পেয়েছি। আমি তা চাইনি”। বোন প্লেটে চামচ রেখে বসল। “আমাকে বলোনি কেন?” লিনা বলল: “ভেবেছিলাম, মাথায় আসাই আমার সম্পর্কে কিছু বলে”।

সাক্ষাৎকারের বার্তার কথাও বলল। সাক্ষাৎকারের সময় শুধু লিনার স্বামী ও বান্ধবী জানত। আর বাবা, যিনি এখনও বলেন “একটি সম্মানিত প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষক”, তিনি কোর্স কিংবা সাক্ষাৎকার কোনোটার কথাই জানতেন না। করিডরে লিনা বলল: “চিন্তা এসে যায়। কী করব, আমি বেছে নিই”। তারপর দুই হাত বাড়িয়ে বিদায় জানাতে শিশুটিকে কোলে নিল।

অতিথিদের খাতা

খাতায় লেখো, কিংবা এমন কোনো মাধ্যমে, যা মন সরিয়ে নেয় না। সময় নাও। কিছু প্রশ্নের জন্য অন্যগুলোর চেয়ে বেশি সততা দরকার:

  1. কোন চিন্তা একাধিকবার এসেছে, অথচ কাউকে বলোনি?
  2. এমন চিন্তা এলে সাধারণত কী করো? তর্ক করো, জোর করে তাড়াও, নাকি চলে যেতে দাও?
  3. “এই চিন্তা আমার সম্পর্কে কী বলে?” প্রশ্নটা কি এখন উত্তর ছাড়াই রেখে দিতে পারো? তারপর নিজের বেছে নেওয়া কাজে ফিরতে পারো?

সাক্ষাৎকারের আগের রাতে লিনা দশটায় বাতি নেভাল। নিজেকে বলল, ঘুমাবে। দরজার পাশে জুতা গুছিয়ে রাখল। ব্যাগের ওপর পোর্টফোলিও রাখল। তারপর শুয়ে পড়ল। ফোন হাতের নাগালে।

তথ্যসূত্র (7)
  1. 1Rachman, S., & de Silva, P. (1978). Abnormal and normal obsessions. Behaviour Research and Therapy, 16(4), 233–248.
  2. 2Radomsky, A. S., Alcolado, G. M., Abramowitz, J. S., et al. (2014). Part 1—You can run but you can't hide: Intrusive thoughts on six continents. Journal of Obsessive-Compulsive and Related Disorders, 3(3), 269–279.
  3. 3Harris, R. (2008). The Happiness Trap: How to Stop Struggling and Start Living. Trumpeter.
  4. 4Wegner, D. M. (1989). White Bears and Other Unwanted Thoughts: Suppression, Obsession, and the Psychology of Mental Control. Viking.
  5. 5Wegner, D. M., Schneider, D. J., Carter, S. R., & White, T. L. (1987). Paradoxical effects of thought suppression. Journal of Personality and Social Psychology, 53(1), 5–13.
  6. 6মুসলিম, সহিহ, হাদিস 132। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। মুখে বলা গুরুতর মনে হয় এমন বিষয় নিয়ে সাহাবিদের প্রশ্ন। সহিহ। হাদিসের পাঠ.
  7. 7বুখারি, সহিহ, হাদিস 3276। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। “সে যেন আল্লাহর আশ্রয় চায় এবং থেমে যায়”। সহিহ। হাদিসের পাঠ.