দ্বিতীয় পর্ব
যখন আলতো করে নিজেদের ধোঁকা দিই
তোমার মাথায় দক্ষ এক উকিল আছে: আগামীকাল করব, আমার পরিস্থিতি কঠিন, আজ ভালো কাজ করেছি, তাই অসুবিধা নেই। সত্যের যে অংশ তোমাকে স্বস্তি দেয়, সে সেটুকু বেছে নেয়। বাকিটা নিয়ে চুপ থাকে। আমরা তার সওয়াল শুনব। তারপর নিয়মটা নিয়েই প্রশ্ন করব: তুমি কি বেছে নিয়েছ, উত্তরাধিকার পেয়েছ, নাকি তোমার ওপর চাপানো হয়েছে? এখানেই নিজের নামে স্বাক্ষর করার সুযোগ আসে।
পঞ্চম অধ্যায়
আমার বন্ধু “আগামীকাল”
যা গুরুত্বপূর্ণ বলে জানি, তা পিছিয়ে দিই কেন?
লিনার ফোনে পাঁচ বছরের পুরোনো একটা বাক্য আছে। তার সঙ্গে এক ফোন থেকে আরেক ফোনে যায়: “সবকিছু একটু শান্ত হলে ডিজাইনের কোর্সটা শুরু করব।” এক সন্ধ্যায় সে বাক্যটা খুলল। কয়েক বছরের মধ্যে এই প্রথম বন্ধ করল না। নিচে দাঁতের চিকিৎসকের সময় আর বোনের উপহারের কথা। ওপরে বৃহস্পতিবারের কাজের তালিকা।
রান্নাঘর থেকে স্বামী ডাকল, “অর্থমন্ত্রীর চা লাগবে?” সে বলল, “একটা ফাঁকা সপ্তাহ লাগবে।” স্বামী চা নিয়ে এল। ছোট পিরিচে কাপ রাখল। তারপর ডেস্কের ধারে বসল। লিনা কোর্সের বাক্যটার ওপর আঙুল সরাল। যেদিন লিখেছিল, সেদিন নিজেকে বলেছিল, “বিয়ের পরে।” বিয়ের পর ঠিক করল, সংসার একটু গুছিয়ে উঠলে শুরু করবে। তারপর পদোন্নতির পরে। পদোন্নতি এলো। বাক্যটা একই জায়গায় রইল।
ডেস্কের ড্রয়ার থেকে পুরোনো খাতাটা বের করল। কাপের পাশে রাখল। খুলল না। কোর্সের ওয়েবসাইট খুলল: তিনটে সাদা ঘর আর টাকা দেওয়ার বোতাম। ঘরগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সাইট বন্ধ করে স্বামীকে বলল, “আগামীকাল।”
তোমার ফোনের নোটের তালিকায় একটা বাক্য বছরের পর বছর পড়ে আছে: “আগামীকাল শুরু করব।” পুরোনো ফোন থেকে নতুন ফোনে এনেছ। একটা অক্ষরও বদলায়নি।
তাহলে এই “আগামীকাল”-এর মানুষটার ওপর ভরসা করি কেন? যাকে কখনো দেখিইনি?
পিছিয়ে দেওয়া শুধু আলস্য নাও হতে পারে। এই মুহূর্তের অস্বস্তিকর অনুভূতি থেকে পালানোও হতে পারে। কাজটা এমন একজনের ওপর চাপাই, যাকে বলি “আগামীকালের আমি”। তাকে এমনভাবে দেখি, যেন সে আমাদের চেয়ে শক্তিশালী আর কম ব্যস্ত। সে যখন আসবে, তখন সে তুমিই হবে। প্রায় একই ক্লান্তি নিয়ে। আর তালিকায় বাড়তি একটা কাজ নিয়ে।
পিয়ার্স স্টিল তাঁর “The Procrastination Equation” বইয়ে কয়েক ডজন গবেষণা নিয়ে আলোচনা করেছেন, যেগুলোতে আমাদের কাজ পিছিয়ে দেওয়ার কারণ খোঁজা হয়েছে1।
পাঁচ মিনিট পরে যার প্রভাব কমে আসে, সেই ব্যথানাশক
প্রচলিত ধারণা হলো, কাজ পিছিয়ে দেওয়া সময় ব্যবস্থাপনার ত্রুটি। কিন্তু গবেষকেরা একেবারে অন্য দিক থেকে দেখেছেন: এখন মেজাজ ভালো করার উপায়। পরে সময় সামলানোর উপায় নয়2।
শেষ যে কাজটা পিছিয়েছিলে, তার সঙ্গে কোন অনুভূতি ছিল: একঘেয়েমি, ব্যর্থতার ভয়, নাকি কাজটার মূল্য নিয়ে সন্দেহ? সেটা বন্ধ করে অন্য কিছু খুললেই স্বস্তি আসে।
কাজটা থেকে পালানোর পুরস্কার পাও।
প্রতিদিন মন ভার হয়ে থাকলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ পিছিয়ে দেওয়ার সঙ্গে মন খারাপ বা বিষণ্নতার যোগ থাকতে পারে। মনোযোগের অসুবিধার যোগও থাকতে পারে। এখানে এই অধ্যায়ের চেয়ে একজন বিশেষজ্ঞ বেশি সাহায্য করতে পারেন।
আগামীকালের অচেনা মানুষ
কার্যকরী এমআরআই ব্যবহার করা এক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা কিছু বৈশিষ্ট্য মূল্যায়ন করেন। সেগুলো এখন আর দশ বছর পরের তাঁদের নিজেদের বর্ণনা করত। একই দুই সময়ে একজন বিখ্যাত ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যও মূল্যায়ন করেন। নিজের সম্পর্কে চিন্তার সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের একটি অংশ ভবিষ্যতের নিজেকে ভাবার সময় কম সক্রিয় ছিল। বর্তমানের নিজেকে ভাবার সময় সেটি বেশি সক্রিয় ছিল3।
নিজের ভবিষ্যৎ সত্তার সঙ্গে দূরত্ব অনুভব করতে পারো। যেন অন্য কারও কথা ভাবছ4। তাই আজ যা বহন করতে চাও না, তা তার ওপর চাপানো সহজ হয়।
আর তোমার মস্তিষ্ক পরে যা আসবে, তার চেয়ে এখন হাতের কাছে যা আছে, তাকে বেশি মূল্য দেয়। একেই বলে “বর্তমানের প্রতি পক্ষপাত”5।
তার মানে কি সব পিছিয়ে দেওয়াই পালানো? না।
কখনো পিছিয়ে দেওয়াটা সত্যিই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। দরকারি জিনিস কিনতে বেতনের অপেক্ষা করো। কিংবা আবার দৌড়াতে নামার আগে সর্দি সারার অপেক্ষা করো।
বিচক্ষণভাবে পিছিয়ে দেওয়ার একটা শর্ত থাকে। যা তুমি নির্দিষ্ট করে বলতে পারো। পালানোর শর্ত অস্পষ্ট: “সবকিছু একটু শান্ত হলে।” কিংবা “জীবনটা গুছিয়ে নিলে।”
“এমন দু’টি নিয়ামত আছে, যে দু’টোতে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তা হচ্ছে: সুস্থতা আর অবসর” (বুখারি 6412)6।
আগামীকালের সঙ্গে সত্যিকারের বন্ধুত্ব
“আগামীকালের আমি”-র সঙ্গে বন্ধুত্ব শুরু হয় তার বোঝা হালকা করলে। সবকিছু তার ওপর ছুড়ে দিলে নয়।
টমাস কার্লাইল লিখেছেন: “তোমার সবচেয়ে কাছের কর্তব্যটি পালন করো, যা তুমি কর্তব্য বলে জানো! তোমার দ্বিতীয় কর্তব্যটি ততক্ষণে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।”7।
তিনটে সাদা ঘর
বৃহস্পতিবারের কাজ শেষ করার আগে লিনা আবার নিবন্ধনের পাতা খুলল। একটা কাগজে লিখল, “আজ রাতেই নিবন্ধন করব। সবকিছু গুছিয়ে নেব।” স্বামীকে বলল, “এবার পিছিয়ে দেব না।” সে জিজ্ঞেস করল, “প্রথম কাজটা কী?” লিনা লম্বা একটা তালিকায় তাকাল: কোর্সের টাকা, ক্লাসের সময়, ডিজাইনের সফটওয়্যার, ডেস্কে একটা জায়গা। কাগজটা উল্টাল। পেছনে কিছু নেই। আরও সস্তা কোর্স খুঁজতে ফোনের দিকে হাত বাড়াল। তারপর কাপের পাশে আবার রেখে দিল। সামনের পাতায় নামের ঘরটা সাদাই রইল। অথচ আজ রাতের প্রতিশ্রুতিতে কাগজের পুরো সামনের পিঠ ভরে গেছে।
কখন ব্যবহার করবে: যখন স্পষ্ট কোনো শর্ত ছাড়া “আগামীকাল”-এর প্রতিশ্রুতি বারবার ফিরে আসে।
সময়: লেখার জন্য পাঁচ মিনিট। প্রথম কাজের জন্য দুই মিনিট। তারপর এক সপ্তাহ পরে ফিরে দেখা।
- অচেনা মানুষটার সঙ্গে দেখা করো: আগামীকালের নিজের জন্য কী রেখে যাচ্ছ, তা লেখো: “সে ঘুম থেকে উঠবে। তখনো রিপোর্ট লেখা হয়নি। আমার বদলে তাকে উদ্বেগে সকাল কাটাতে হবে।”
- কাজটা ছোট করো: “কোর্সে নিবন্ধন করব” নয়। বরং “এই পাতা বন্ধ করার আগে দুই মিনিটের মধ্যে সাইট খুলব। নাম আর ইমেইল লিখব।”
- পিছিয়ে দেওয়ার জমা হিসাব লেখো: প্রতিশ্রুতির পাশে আন্দাজ করে লেখো, কতবার তা দিয়েছ। আগামী সপ্তাহে আবার যতবার দেবে, প্রতিবার লেখো। তারপর কাছের কোনো মুহূর্তের সঙ্গে শুরুটা বাঁধো। যেমন পরের কাপ কফি।
পড়ে গেলে: ফিরে আসা অনুভূতিটার নাম দাও। প্রথম কাজটা আবার আরও ছোট করো। কাছের একটা সময় ঠিক করো।
দুই মিনিটের মধ্যে নাম আর ইমেইল লিখল লিনা। টাকা দেওয়ার ঘরে এসে থামল। খরচের তালিকা খুলল। কোর্সের পাতা বন্ধ করল। স্বামী দেখল পর্দা নিভে গেল। বলল, “কোথায় পৌঁছালে?” সে বলল, “টাকা দেওয়ার পরে আর না যাওয়ার ভয়টার কাছে।”
“পড়ে গেলে” লাইনে ফিরল। কাগজের পেছনে অনুভূতিটা লিখল। তারপর আরও ছোট একটা কাজ: কিস্তির পরিমাণ নিশ্চিত করা। আগামীকাল চায়ের পরে। সেদিন রাতে অন্য কোনো কোর্স খুঁজল না। নাম আর ইমেইল সংরক্ষিত রাখল।
পরের দিন স্বামী কাপ পিরিচে রাখলে টাকা দেওয়ার পাতা খুলল। কাজটা শেষ করল। প্রথম ক্লাসের সময় দেখাল তিন সপ্তাহ পরে, বুধবার সন্ধ্যায়। বৃহস্পতিবারের কাজ জমা দেওয়ার সময়ের পাশে সময়টা লিখল। কল্পনার কোনো ফাঁকা দিনে নয়। বলল, “একটা ঘর পূরণ করতে শান্ত একটা সপ্তাহ দরকার নেই।”
স্বামী জিজ্ঞেস করল, “আর তোমার বাবা? কখন জানাবে?” ক্যালেন্ডারের ওপর তার আঙুল স্থির হয়ে গেল। বলল, “প্রথম ক্লাসের পরে।”
অচেনা মানুষটার সঙ্গে সাক্ষাতের সময়
নোটের অ্যাপ খোলো। সবচেয়ে পুরোনো “আগামীকাল” বাক্যটা খুঁজে বের করো। তারপর একটা প্রশ্ন: সেটা পিছিয়ে দেওয়ার সময় কোন অনুভূতি থেকে পালাও? একঘেয়েমি? ব্যর্থতার ভয়? নাকি তুমি এর যোগ্য কি না, সেই সন্দেহ?
এই পাতা বন্ধ করার আগে এখনই যদি ছোট একটা অংশ শেষ করো, তাহলে নিচে আগামীকালের নিজের জন্য একটা বাক্য লেখো: “তোমার জন্য শুরু করে দিলাম। বাকিটা শেষ করো।”
এক সপ্তাহ পরে একই বাক্যে ফিরে এসো: কাজটা ছোট করায় সেই অনুভূতির তীব্রতাও কি কমেছে? নাকি এখনো এমন শর্তের অপেক্ষায় আছ, যা নির্দিষ্ট করে বলতে পারো না?
সেই রাতেই লিনার ফোনের পর্দায় “বাবা” নামটা জ্বলে উঠল। সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতা খোলা ছিল লোগোর পাতায়। নামটার দিকে তাকাল। ফোনের দিকে হাত বাড়াল না। নামটা জ্বলতেই থাকল। শেষে নিভে গেল।
তথ্যসূত্র (7)
- 1Steel, P. (2011). The Procrastination Equation: How to Stop Putting Things Off and Start Getting Stuff Done (1st U.S. ed.). Harper.
- 2Sirois, F. M., & Pychyl, T. A. (2013). Procrastination and the priority of short-term mood regulation: Consequences for future self. Social and Personality Psychology Compass, 7(2), 115–127.
- 3Ersner-Hershfield, H., Wimmer, G. E., & Knutson, B. (2009). Saving for the future self: Neural measures of future self-continuity predict temporal discounting. Social Cognitive and Affective Neuroscience, 4(1), 85–92.
- 4Hershfield, H. E. (2011). Future self-continuity: How conceptions of the future self transform intertemporal choice. Annals of the New York Academy of Sciences, 1235(1), 30–43.
- 5Laibson, D. (1997). Golden eggs and hyperbolic discounting. Quarterly Journal of Economics, 112(2), 443–478.
- 6বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস 6412. হাদিসের পাঠ.
- 7Carlyle, T. (1833–1834). Sartor Resartus, Book II, Chapter IX: The Everlasting Yea. Project Gutenberg.